রুটি মেশিন তৈরীর কাহিনী

রুটি মেশিন তৈরীর কাহিনী
September 28, 2019 1 Comment Blog cadsonbd

ক্যাথওয়েল্ড কন্সট্রাকশন কোঃ লিঃ এর সংগে আমার ব্যবসায়িক সম্পর্ক। আমি আমার সৃষ্টিশীল কাজের দ্বারা যে ব্যাবসা ক্ষেত্র তৈরী করি, মূলত সে সকল কাজ ক্যাথওয়েল্ড এর ওয়ার্কশপে আমি করি। সেখানে আমার তৈরী কিছু দক্ষ-অদক্ষ জনবল রয়েছে, আমার এই সকল কাজ করার জন্য। ২০০৭ সন থেকে ক্যাথওয়েল্ড এর আশুলিয়া ওয়ার্কশপে আমি আমার নিজস্ব ডিজাইনে ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ফার্নিচার তৈরী করে আসছি, যাহা আমাদের দেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে মূলত প্রডাকটিভিটি বাড়ানোর জন্য ওয়ার্কষ্টেশন হিসেবে ব্যবহার হয়। এছাড়াও আমার তৈরী পোষ্ট ওয়েল্ড হিট ট্রিটমেন্ট মেশিন, ফিল্ম ড্রায়ার, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ওয়াশিং মেশিন, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইাড্রো-এক্সট্রাক্টর মেশিন, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল গার্মেন্টস ড্রায়ার মেশিন, হিট ট্রান্সফার মেশিন ইত্যাদি রয়েছে। এখানে আমি একজন নির্বাহী পরিচালকের দ্বায়ীত্ব পালনের পাশাপাশি নতুন নতুন উদ্ভবনী মূলক ডিজাইন, কাষ্টমারদের সহায়তা ও আমার কর্মীদের কাজে সহায়তা প্রদান করি। ক্যাথওয়েল্ড কন্সট্রাকশন কোঃ ২০১৩ সনের ডিসেম্বরে আর্মি সেক্টর থেকে একটি রুটি তৈরীর মেশিন সাপ্লাই করার অর্ডার পায়। বিষয়টা আমার এক সহকর্মীর থেকে জানার পর, ডিসেম্বর থেকেই আমি একটা অত্যাধুনিক মেশিন ডিজাইনের কথা ভাবতে শুরু করি । ইন্টারনেট থেকে অনেক ইন্ডিয়ান ও তাইওয়ান মেশিনের ছবি ও ভিডিও দেখি কিন্তু সে সব মেশিন আমার ভাল লাগেনি। একদিন জার্মানী কোম্পানীর ইউটিউব এ একটা ভিডিও দেখি এবং সেখান থেকেই আমার অনুপ্রেরনা আসে। আমি একটি দৃষ্টি নন্দন, অত্যাধুনিক, সাস্থ্য সম্মত রুটি তৈরীর মেশিন ডিজাইন করার কথা ভাবি। সেই সাথে আমাদের দেশের আর্মি, পুলিশের রুটি বানানোর সমস্যাটাও খুব ভাল ভাবে উপলব্ধি করতে পারি। বন্যা দূর্গতদের সাহয্যের জন্য আমাদের দেশের এই সকল বাহিনীর উপর যে, ত্রান, খাদ্য সরবরাহের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়, তার মধ্যে রুটি তৈরী একটি কঠিন কাজ হয়ে দাড়ায়। তাই আমি নিজ উদ্যোগে রাত জেগে বাসায় বসে আমার নিজস্ব কম্পিউটারে সলিডওয়ার্কস নামক একটি থ্রিডি ক্যাড সফ্টওয়ারে ডিজাইন এর কজ শুরু করি। প্রথমে আমার সহধর্মীনির কাছ থেকে জানি যে, রুটি বানাতে কতটুকু আটাতে কতটুকু পানি, লবন লাগে। তার রুটি নিয়ে মেপে দেখি সেই রুটির ব্যাস ও পুরুত্ব কত। তার রুটি বানানোর সময় ঘড়ি ধরে দাড়িয়ে থাকি দেখার জন্য যে, কতবার ‍উল্টোতে হয়, একটা রুটি ভাজতে কত সময় লাগে। এভাবে আমার মেশিনের প্রাথমিক ডিজাইনের কাজ ও ক্যালকুলেশন শুরু হয়। এইটুকু জ্ঞানে তো হবে না। বিশ্বে অনেক প্রকার রুটির রেসিপি আছে যা আমাদের খাওয়া হয় না। কিন্তু আমাকে এমন একটি মেশিন বানাতে হবে যাতে পৃথিবীর সবাই ব্যাবহার করতে পারে। তারপর শুরু হয় রুটি তৈরীর উপর ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি। পাশাপাশি ম্যাকানিক্যাল ডিজাইন করে চলেছি। ২০১৪ এর জানুয়ারী মাসে ইন্ডিয়া থেকে মেশিনটি চলে আসে এবং ফেব্রুয়ারীতে ইন্ডিয়ান টেকনিশিয়ান আসতে দেরী করায় আমাকে মেশিনটি কমিশনিং করতে অনুরোধ করা হয়। মেশিনটি দেখে আমার মোটেও পছন্দ হয় নাই। কারণ মেশিনটির কোন কন্ট্রল প্যানেল নেই। ঘন্টায় ২৫ কেজি গ্যাস লাগে। ৪৪০ ভোল্ট এ চলে। বিশাল আকৃতির ও অনেক ওজন। রুটির মান সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রন করা যায় না, অনেক মুভিং পার্টস ইত্যাদি । উদ্ভবনী মূলক কাজে আমার একটা নেশা আছে সত্যি, কিন্তু আর একটা বিষয় আমার মধ্যে কাজ করেছে, কেন ইন্ডিয়া ? কেন বংলাদেশ নয় ? সেখানে কিছু আর্মি অফিসারদের আমার ডিজাইনের কথা জানাই ও আমার ট্যাব থেকে তাদের প্রাথমিক থ্রিডি ডিজাইনটা দেখাই। তারা আমাকে অনেক উৎসাহ দেন এবং জানান যে, আপনার এই মেশিনটি অনেক ভাল হবে আরও জানান তাদের ২০০ এর বেশী মেশিন লাগবে। ওখান থেকে এসেই আদা জল খেয়ে লেগে পরলাম। ভাবলাম একটা পি, এল, সি কন্ট্রল মেশিন বানাবো যেখানে হিউম্যান মেশিন ইন্টারফেস থাকবে। সাধারণত এই ধরনের কাজে একটি টিম লাগে। যেখানে ম্যাকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল, পি, এল, সি প্রগ্রামার ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার লাগে। আমি ম্যাকানিক্যাল ইন্জিনিয়ার হলেও সকল কাজে আমার সমান দক্ষতা রয়েছে। যা, এর আগে আমি কাজে লাগানোর মত তেমন কোন সুযোগ পাইনি। যখন দেখলাম যে, এখানে আমার সেই সুযোগ রয়েছে, তখন আমি আরো বেশী উৎসাহিত হলাম। আর একে একে ম্যাকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল, পি, এল, সি প্রগ্রাম নিজেই করলাম ও গ্রাফিক্স ডিজাইন করে দৃষ্টি নন্দন একটি হিউম্যান মেশিন ইন্টারফেস ডিজাইন ও প্রগ্রাম করে ফেললাম। আমি নিয়মিত আমার ডিজাইনের রেন্ডার করা ছবি ফেজবুকে পোষ্ট দিয়ে থাকি। অনেক ফেজবুক ফ্রেন্ডস্‌ আছেন যারা নিয়মিত আমার পোষ্ট এ লাইক কমেন্ট করে আমাকে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। বুঝতে পারি যে, একটা ভাল কাজে হাত দিয়েছি, এটাকে যে করেই হোক এগিয়ে নিতে হবে। অনেক বাধাঁ এসেছে কিন্তু আমাকে আটকাতে পারেনি। আমি ইন্ডিয়ান মেশিন এই দেশে আসা আটকে দিয়েছি। ২০১৫ সন পর্যন্ত আমাকে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছে। মেশিন যতই ভাল আর অত্যাধুনিক হোক দামটা ইন্ডিয়ান মেশিন থেকে বেশী হতে পারবে না। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টা একটা চ্যালেন্জ ছিল। মনে হচ্ছিল আমি একা সবাই আমার বিপক্ষে। ফেজবুকে আমার ডিজাইন দেখে আমাদের এমডি আমাকে বলেন মেশিনটি তৈরী করার করা যায় কিনা ? আমি একটা বাজেট করে ওনাকে দিলাম এবং কারখানায় ২০১৪ এর ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে প্রটোটাইপের কাজ শুরু করলাম। এপ্রিল’২০১৪ এর শেষের দিকে মেশিনের ষ্ট্রকচার দাড়িয়ে যায় এবং জুনের মাঝামাঝি কাজ শেষ হয়। এর পরের ব্যাপারটা অনেক মজার। মেশিন তো বানিয়েছি এখন এটা কি ভাবে চালাতে হবে তা তো জানি না। কখনো রুটি পুড়ে যাচ্ছে, কখনো ভাল হচ্ছে। কত স্পিড হবে, কত টেম্পারেচার হবে, খামিতে তেল দিতে হবে এসব আমরা কিছুই জানি না। আবার শুরু হলো আমার নেট ঘাটাঘাটি। একদিন নেটে আমেরিকার একটা ডকুমেন্ট পড়ে জানতে পারি মেশিনে রুটি বানাতে হলে কি কি নিয়ম মেনে চলতে হবে, কত সময় প্রি-হিট দিতে হবে , ইত্যাদি। প্রেস প্লেটকে ননষ্টিক করার জন্য অনেক পদ্ধতি ব্যবহার করেছি। কিন্তু রুটি প্রেসে আটকে যাচ্ছিল। পরবর্তীতে অনেক খোজা খুজির পর সাভার এর একটা ননষ্টিক প্যান তৈরীর কারখানা থেকে অনেক অনুরোধ করে ননষ্টিক পেই্ন্ট করা হয়। এরপর মেশিনটি আর্মিদের দেখানো হয়। তারা পছন্দ করেন আর আমাকে বলেন, আরো ওজনে হালকা এবং দুজোন জোয়ান ধরে গাড়িতে তুলতে পারে এবং মিশনে নিয়ে যেতে পারে এমন কিছু করা যায় কিনা ? পরে তারা মেশিনটি এস টি ব্যাটেলিয়ান, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এ পরিক্ষামূলক চালনার জন্য দিতে বলেন। মেশিনটি সেখানে দেওয়ার পর তারা ৮ মাস এটি ব্যবহার করেন। আমি নিয়মিত সেখানে যাই ও বাবুর্চিদের সাথে কথা বলি। তাদের সুবিধা অসুবিধা সকল নোট করি আর রাতে বাসায় এসে সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করি। কখনও ম্যকানিক্যাল ডিজাইন এ পরিবর্তন এনেছি কখনো পি এল সি প্রোগ্রাম লিখেছি। এ ভাবে আমার বর্তমান ডিজাইন এগোতে থাকে। জুন মাসে চট্টগ্রাম একটি কোম্পানী এক সেট মেশিনের অর্ডার দেয়। শুরু হয় নতুন ডিজাইনের কাজ । দুই মাস পর টাংঙ্গাইল পুলিশ থেকে আর একটি অর্ডার পাই তার মাসখানেকের মধ্যে আর্মিদের ৭টি মেশিনের কাজ পাই। প্রতি মাসে ২ সেট করে মেশিন বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে বসানো হয়। এই মেশিন এর কাজ চলাকালীন অনেক পুলিশ ও আর্মি অফিসার আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, সেমি-অটো এর পরিবর্তে ফুল অটো করা যায় কিনা । বিষয়টা আমার মাথায় ঘুরতে থাকে কিন্তু কোন অনুপ্রেরনা পাই না। নানান প্রতিকুল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। তার উপর কাজের চাপ। একদিন গাড়িতে বসে বসে ভাবছি, কি করে ডো কাটিং করে প্রেসে নিয়ে ফেলবো ? কি করে ফুল অটো করা যায়। নেট থেকে তো কোন হেল্প পাচ্ছি না। নিজেকেই খুজেঁ বের করতে হবে। হঠাৎ ঢেকির কথা মনে এল তারপর মনে করার চিন্তা করলাম ঢেকির মত এমন কি আছে যা একপাশ এর জিনিস তুলে নিয়ে আর এক পাশে ফেলে ? অমনি মনে পরে গেল আগের দিনের সেচ কাজে ব্যাবহৃত নৌকার মত একটা জিনিস। মনে হল যে, এমনটা হলে খামি দেবার হোপারটি আর বেশী উপরে তুলতে হবে না। পেয়ে গেলাম অনুপ্রেরনা, শুরু হল ডিজাইন । ৯টি মেশিন ডেলিভারির পর শুরু করলাম অটো মেশিনের কাজ। ১ মাস এর মধ্যে মেশিন হয়ে গেল টেষ্ট করতে গিয়ে মনে হল, কেন বিদেশীরা এই রোটারি টাইপ মেশিন অটো করে নাই। অনেক সমস্যা। কিন্তু সফল আমাকে হতেই হবে। দিনে ওয়ার্কশপে কাজ করেছি আর রাতে বাসায় ডিজাইন পরিবর্তন। এভাবে চললো কিছুদিন। মাঝে মাঝে ডো আটকে যাচ্ছে। তাই এই লম্বা ঠেকির মত ট্রে টা নিয়ে ভাবতে লাগলাম । অনেক সময় আমরা সহজ জিনিসকে কঠিন করে দেখি। ভাবলাম আমি কি তাই করছি ? ঠেকি করার মূল উদ্দেশ্য ছিল , যাতে বেশী উচুতে গিয়ে খামি দিতে না হয়। দেখলাম আমার সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। হেপারটি যে উচ্চতায় এসেছে তাতে সরাসরি প্রেসে ডো ফেলা যায়। তাই সরাসরি প্রেসে ডো ফেলার ব্যবস্থা করলাম। লম্বা ঠেকির মত ট্রে টা সফল না হলেও, একটা কাজ হয়েছে যে, সেটা আমাকে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরনা যুগিয়েছিল। নাহলে অটো মেশিনের কাজ শুরুই হত না। প্রায় ২০ বার বিভিন্ন ভাবে প্রেক্টিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট করার পর সঠিক ভাবে ডো প্রেসে ফেলতে সক্ষম হলাম। কিন্তু আর এক বিপত্তি দেখা দিল। রুটি একটা গোলাকার হয় তো আর একটা ডিম্বাকৃতি। দিন-রাত ভাবতে থাকলাম কোন কুল কিনারা করতে পারছি না। ডো-বল কাটার পর যখন প্রেসে যায় তখন ডো-বল কি ভাবে আসে এবং কেন কাঁত হয়ে প্রেসে চাপ লাগে ভাল করে মনিটর করতে লাগলাম। ভিডিও করে নিয়ে রাতে বাসায় বসে স্লো-মোশনে দেখতে থাকলাম। লক্ষ করলাম ডো কখনো কখনো চাকতির মত গড়িয়ে প্রেসে গিয়ে সরাসরি আটকে যায়, আর তাই রুটি লম্বাটে ডিম্বাকৃতি হয়। সমাধান চিন্তা করতে লাগলাম। জানি ইন্টারনেট ঘেটে কোন কাজ হবে না। এমন এক টেফলনের চাকতি ডিজাইন করলাম যেটা ডো-কে মাঝ পথে হালকা বাধাঁ দেবে এবং নিজে ঘুরে গিয়ে ডো-কে যেতে দেবে। তাতে করে ডো চাকার মত গড়িয়ে না গিয়ে, কাতঁ হয়ে পরে স্লিপ করে প্রেসে যাবে। তাতে করে ৯৯% রুটি গোলাকার হতে লাগলো। ডোতে আটার গুড়ো লাগানোর জন্য যে পদ্ধতিটি করেছিলাম সেটাতে পরিবর্তন এনে একটি ২৪ ভোল্ট এর মটর লাগানো হয়েছে এবং গুরো দেবার পরিমাণ পি এল সি থেকে নিয়ন্ত্রন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন মেশিনটি সম্পূর্ন সয়ংক্রিয় ভাবে আটার খামি থেকে ডো-বল তৈরী করে রুটির গোলাকার আকৃতি দিয়ে ভেজে দিতে পারে। যার পরিমান ঘন্টায় ৯০০ টি রুটি। এবারে বলবো কোন কোন বিষয়ের উপর আমি বিশেষ ভাবে জোড় দিয়েছি এবং কি কি কারণে এই মেশিনটি অন্য বিদেশী মেশিন থেকে উন্নত ও আলাদা। কি ভাবে ধাপে ধাপে সকল মাপ সঠিক ভাবে ডিজাইন করতে পেরেছি। প্রথমে আমি যখন সেমি-অটো মেশিন ডিজাইন শুরু করি তখনই আমি ঠিক করে নেই কোন কোন বিষয়ের উপর আমি বেশী গুরুত্ব দেব। আমাদের দেশের মানুষ এর উচ্চতা, বাবুর্চিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈদ্যুতিক সহজলভ্যতা, কম গ্যাস খরচ, সহজে পরিষ্কার করা, নিরাপত্তা ও সাস্থসম্যত হওয়া। অতিরিক্ত সুবিধার জন্য ডুয়েল অপারেটিং প্যানেল, ডুয়েল গ্যাস সিস্টেম, ডিজিটাল টাচ স্কিনে সতর্ক বার্তা, বাংলায় রেসিপি ও সমস্য সমাধান দেওয়ার পরিকল্পনা করি। ডিজাইনের শুরুতে ভিডিও দেখে কোন কিছুর মাপ বোঝাটা খুব কঠিন ছিল। তাই আমার নিজস্ব ক্যালকুলেশন ও অনুমানের ‍উপর নির্ভর করে ষ্ট্রাকচার ডিজাইন করতে হয়েছে। এবং পরে আষ্তে আস্তে পরিবর্তন করতে হয়েছে। তাই আমার মেশিনের আকৃতি দেখতে জার্মানির বেসকো কোম্পানীর মত হলেও কোন মাপ ঐ মেশিনের সাথে মিলবে না। আমার বেসিক মাপ ছিল রুটির মাপ। আমার মেশিনে ৪ থেকে ৮ ইঞ্চি ব্যাস ও ১.৫ থেকে ২.৫ মি. মি. পুরু রুটি বানাতে হবে। একটা রুটি ভাঁজতে ৫২ থেকে ৬০ সেকেন্ড সময় লাগে । ঘন্টায় ৯০০ রুটি বানাতে গেলে প্রতি রুটির জন্য ৪ সেকেন্ড সময় লাগবে । একটি তাওয়ায় ৪টি রুটি নেওয়া যাবে । একটি তাওয়ায় ১৫সেকেন্ড করে থাকবে তারপর ‍উল্টে গিয়ে পরের তওয়ায় থাকবে আবার ১৫ সেকেন্ড। এভাবে ৪টি তাওয়ায় ১৫ X ৪ = ৬০ সেকেন্ডে সময় লাগবে প্রতিটি রুটি ভাজার জন্য। যেহেতু প্রতি ৪সেকেন্ডে ১টি করে রুটি তাওয়ায় আসে ও একটি তাওয়ায় ৪টি রুটি জায়গা হয় আর ১৫ সেকেন্ডে পরের তাওয়ায় যায় তাই প্রতি ৪ সেকেন্ডে ১ টি করে রুটি বের হয়। তাই ৩৬০০ ÷ ৪ = ৯০০ রুটি ঘন্টায় পাওয়া যাবে। একটি হোটেলের পরোটা ভাজার তাওয়া একদিন টেম্পারেচার মিটার দিয়ে মাপলাম। দেখলাম মাঝখানে ২৫০ ডিগ্রি সেঃ ও পাশে ১৮০ ডিগ্রি সেঃ আছে । সেখান থেকে পেয়ে গেলাম প্রি হিট ১৮০ ও তাওয়া ২৫০ ডিগ্রি সেঃ থাকবে প্রয়োজনে কম বেশী করা যাবে।প্রেস ডিজাইন ছিল মেশিনের সবচাইতে জটিল ম্যাকানিজম। আমেরিকান নিয়ম অনুযায়ী ১৮০ ডিগ্রি সেঃ এ ০.৯ থেকে ১.২ সেকেন্ড পর্যন্ত সময় ডো কে চাপ দিতে হবে। তাই মটরের আর পি এম অনুযায়ী ক্যাম এর কার্ভ ডিজাইন অনেকটাই কষ্টসাধ্য ছিল। এর জন্য ডিজাইনে অনেক সময় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। কত ডিগ্রি এংগেলে রুটি প্রেস হলে রুটি তাওয়ায় ঠিক ঠাক মত যাবে, স্পিড কম বা বেশী হবে না। এই বিষয়টিও ‍ছিল খুব জটিল। কারন গ্রাভিটি ফোর্সে একটা ৪০ থেকে ৬০ গ্রাম ওজনের রুটি কত এংগেল থেকে ছাড়লে, সেটা কত দুরত্বে গিয়ে থামবে এর জন্য কিছুটা অনুমান কিছুটা প্রেকটিক্যল করে ডিজাইন করি । পরবর্তিতে দ্বিতীয় ডিজাইনে এংগেলে কিছুটা পরিবর্তন আনি।রুটি বানানোর জন্য প্রধান ২ টি বিষয় হল সঠিক তাপমাত্রা ও সময়। ইন্ডিয়ান মেশিনে অপারেটরকে এই কাজ চুলার মত নিয়ন্ত্রন করাতে হয় ও আগুন হতে দিয়ে জ্বালাতে হয় যা নিরাপদ না। জার্মানি মেশিনে অপারেটরকে ২টি নব ঘুরিয়ে নিয়ন্ত্রন করতে হয়। অথচ আমার মেশিনে এসব কিছুই করতে হয় না। একটা বাটন চাপলে প্রথমে তাওয়া ঘুরবে, ইগনেশন হবে, গ্যাস ভাল্ব অন হয়ে আগুন জ্বলবে, হিটার অন হবে এভাবে সব কিছু সয়ংক্রিয় ভাবে হবে। তাপমাত্রা, আগুন কমানো বাড়ানো সয়ংক্রিয় ভাবে হবে। আমার মেশিনে অপারেটরকে এইসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। এরপর ডো-বল কাটিং মেশিন ডিজাইনের জন্য কাজ শুরু করি। অনেক মেশিন ইন্টারনেটে দেখেছি কিন্তু আমার মন মত তেমন কোন মেশিন পাইনি। কারণ সবই ম্যাকানিক্যল অথবা ম্যাকানিক্যাল ও নিউমেটিক এর সমন্বয়ে তৈরী। শুধু ম্যাকানিক্যাল হলে বেশী গিয়ার ব্যাবহারে অনেক শব্দ হবে। সুক্ষ ভাবে সাইজ নিয়ন্ত্রন করা যাবে না। নিউম্যাটিক আমি আমার কোন মেশিনে ব্যাবহার না করার সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নিয়েছিলাম।। কারণ আমি চাইনি মেশিন চালনার জন্য একটি কম্প্রেসার ব্যাবহার হোক। কারণ এই মেশিন মিল ফেক্টরীতে তেমন ব্যাবহার হবে না। তাই আমি ইলেক্ট্রো-ম্যাকানিক্যাল করেছি এবং নান্দনিক ছোট আকারের একটা ডিজাইন করেছি, যা পৃথিবীর কোন ডো-কাটিং মেশিনের সাথে মিলবে না। এই মেশিনে সেন্সরের পজিশন এডজাষ্ট করে ডো-বল এর সাইজ সুক্ষ ভাবে নিয়ন্ত্রন করা যায়। কাউন্টার ব্যাবহার করা হয়েছে তাই কতগুলো কাটিং হয়েছে তা দেখা যায়। কাটিং ক্যাপাসিটিও 500 থেকে 3000 সেট করা যায়,যা আর কোন মেশিনে হয় না। অটো মেশিনের জন্য ডো-কাটিংএর ডিজাইনে কিছুটা পরিবর্তন ও সংযোজন করা হয়েছে।মিক্সার মেশিনটির তেমন কোন নতুনত্ত্ব নাই কারণ এই মেশিন দীঘকাল যাবত বিভিন্ন কাজে ব্যাবহার হয়ে আসছে। তবে আমার মেশিন যাতে ২২০ ভোল্টে চলে তাই ইন্ভারটার ব্যাবহার করা হয়েছে। লক সেফটি রাখা হয়েছে এবং টাইমার ব্যাবহার করা হয়েছে।

Cadson
Leave Comment
  1. 1

    MD Shamim ahmad

    Long time experiments but successful I respect experiments

    Reply

Leave a reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *